বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ০৯:০২ অপরাহ্ন
Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ, ২০২১, ০৯:১৮ AM
  • ৭০ বার পড়া হয়েছে
আড়াই হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার

বাবর, রুবেল, বরকতসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, মাদক ব্যবসা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিসহ অবৈধভাবে অর্জন করা আড়াই হাজার কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচারের আলোচিত মামলায় ফরিদপুরের বাবর, রুবেল, বরকতসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার সিএমএম আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা।

যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক খোকন রাজাকারের আপন ভাগনে ফরিদপুরের দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেল। তাদের খালু যুদ্ধাপরাধ মামলার আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি বাচ্চু রাজাকার। স্বাধীনতাবিরোধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ স্বজন হওয়ার পরেও বরকত বাগিয়ে নেন শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ। আর রুবেল ভাইয়ের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সাংবাদিক না হয়েও জোর করে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতির পদ দখলে নেন।

 

এরপর ফরিদপুর সদরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর ও যুবলীগের নেতা এ এইচ এম ফুয়াদের মাধ্যমে বলয় সৃষ্টি করে গত এক যুগ ফরিদপুর আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন দুই ভাই। তাদের ইশারায় পুরো জেলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে সব ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। ক্ষমতার আশপাশে থেকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেন তারা। এই পরিকল্পনায় সফল হওয়ার পরই তারা টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে সরকারের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে কমিশন নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান। তাদের এই কর্মকাণ্ডকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর এবং এ এইচ এম ফুয়াদ। এদের দুজনের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পরামর্শে সব ধরনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, মাদক ব্যবসা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি করে অবৈধভাবে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হন তারা। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেন।

চার্জশিটে অভিযুক্ত অপর আসামিরা হলেন—এ এইচ এম ফুয়াদ, শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি খন্দকার নাজমুল ইসলাম লেভী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা আশিকুর রহমান ওরফে ফারহান, যুবলীগের নেতা ফাহান বিন ওয়াজেদ ফাইন ওরফে ফাহিম, কামরুল হাসান ডেভিড ওরফে ডেভিড, মোহাম্মদ আলী মিনার ও মো. তারিকুল ইসলাম ওরফে নাসিম। এই দশ আসামির বাইরে আরো ৪১ জনের বিরুদ্ধে এই মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্য-উপাত্তে তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে সম্পূরক চার্জশিটে আসামি করা হবে বলেও জানান তদন্ত কর্মকর্তা। গতকাল বুধবার চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত চার্জশিট আমলে নিয়ে মামলার নথি ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে পাঠাবেন।

তদন্ত সূত্র জানায়, ৭২ পৃষ্ঠা চার্জশিটে ৪৩ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। অপর চার্জশিটভুক্ত আসামিদের ৪২ জন সহযোগীর মধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করেছে। ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলে সূত্র জানায়।

গত বছরের ২৬ জুন সিআইডির পরিদর্শক এস এম মিরাজ আল মাহমুদ বাদী হয়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ঢাকার কাফরুল থানায় ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বরকত ও তার ভাই রুবেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলা নম্বর ২৪।

এর আগে গত ২৪ ফেব্রয়ারি বরকত ও রুবেলের মালিকানাধীন কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি জব্দের আদেশ দিয়েছে ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। ঐ জব্দ আদেশের মধ্যে রয়েছে ৪৬৭টি দলিলের অধীনে ৫ হাজার ৭০৬ বিঘা জমি, প্রাইভেট কার, বাস ও ট্রাকসহ ৫৫টি গাড়ি এবং ১৮৮টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, আসামি সাজ্জাদ ও বরকতের আপন মামা মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি জাহিদুর রহমান ওরফে খোকন রাজাকার। এছাড়া ফরিদপুর জেলার সালতা থানাধীন বড়খারদিয় গ্রামের আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার তাদের আপন খালু ও ফরিদপুর জেলা ফ্রিডম পার্টির একসময়ের ডাকসাইটে নেতা বাদশা মণ্ডল তাদের আপন চাচা। বরকত ও রুবেল ১৯৯৪ সালের ২৪ নভেম্বর ফরিদপুর জেলার বিএনপি নেতা চাঁন খন্দকারের ভাড়াটে গুণ্ডা হিসেবে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক অ্যাডভেকেট মহিউদ্দিন খোকন হত্যা মামলার আসামি। ঘটনার পর থেকে তারা পলাতক ছিলেন। ২০০৮ সালের পূর্বে বরকত ও রুবেলের তেমন কোনো সম্পত্তি ছিল না। সাধারণ জীবনযাপন করতেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি দল পালটে বরকত আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পরে অবৈধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফরিদপুর জেলার রোডস, পিডব্লিউডি, এলজিইডি, হেলথ, বিআরটিএ, পৌরসভা, বিদ্যুত্, জেলা পরিষদ, ফ্যাসলিটিজ, সিএমএমইউ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, টেপাখোলা গরুর হাট, সিঅ্যান্ডবি ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সব ধরনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও কমিশন বাণিজ্য, মাদক ব্যবসা, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও জেলা রেজিস্টার অফিসের দলিলসংক্রান্ত কমিশন বাণিজ্য করে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেন।

গত বছরের ৭ জুন রাতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে হামলা মামলার আসামি হিসেবে শহরের বদরপুরসহ বিভিন্ন মহল্লায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ বরকত, রুবেলসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে। এ মামলার তদন্তে গিয়ে এ দুই ভাইয়ের আড়াই হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের সন্ধান পায় সিআইডি। পরে এই মামলায় তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়। নেওয়া হয় রিমান্ডে। রিমান্ডে থেকে পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা। সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা কীভাবে বিদেশে পাচার করেছেন এবং এর সুবিধাভোগী কারা, তার বিস্তারিত বর্ণনা দেন তারা। এছাড়া এসব অর্থ কীভাবে এবং কাদের সহায়তায় অর্জন করেছেন, তাদের নামও প্রকাশ করেন ঐ জবানবন্দিতে। ইতিমধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করেছে। এছাড়া চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রসহ বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত চলমান।

Please Share This Post in Your Social Media

এই জাতীয় আরো নিউজ

© All rights reserved © 2020 bd-bangla24.com

Theme Customized By Subrata Sutradhar