শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:২৩ অপরাহ্ন
Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ০৩:০০ PM
  • ১৮৫ বার পড়া হয়েছে

তিক্তকথন

লেখকঃ ডঃ মোঃ নুরুল আমিন।
একোয়াকালচার টেকনিক্যাল অফিসার,
ইন্সটিটিউট ফর মেরিন এন্ড এন্টার্ক্টিক স্টাডিজ (আই এম এ এস),
লাঞ্চেস্টন,
ইউনিভার্সিটি অব তাসমানিয়া
অস্ট্রেলিয়া ।

যমুনা ব্রীজের উপারে রেল স্টেশনে বসে চা খাচ্ছিলেন মীর্জা মোহাম্মদ চৌধুরী। ট্রেন কিছুটা আসতে দেরি। তাই চা খেয়ে সময় পার করার চেষ্টা। চৌধুরী সাহেব একজন বিসিএস ক্যাডার, সচিবালয়ের আমলা। পাশেই কলা রুটি খাচ্ছিলেন আসাদ মিয়া। অত্যন্ত সাধারণ জীবন। সেও ঢাকায় যাবেন। ঢাকায় ক্ষুদ্র একটি বইইয়ের দোকান আছে । গল্প, উপন্যাস, পত্রিকা, নিউজপেপার ছাড়াও কিছু চটি বই আছে। কিন্তু চটি বইগুলো ডিসপ্লে করেনা। এগুলোর কাস্টমার অনেক, ডিসপ্লে ছাড়াই বিক্রি হয়। কাস্টমার এর তালিকায় আছে কম বয়সী চাকুরীজীবি, ছাত্র, ভিন্ন পেশার মানুষ।

চা খেতে খেতে আসাদ মিয়া চৌধুরী সাহেবকে প্রশ্ন করেন,

“ভাই, আপনি ঢাকায় চাকরি করেন?”

চৌধুরী সাহেবের বিরক্তসুচক উত্তর, “হ্যা।“

“কোন বিভাগে?”

“সচিবালয়ে।“

“ও আচ্ছা, কোন পদে?”

চৌধুরী সাহেব রেগে গেলেন,
“সেটা কি আপনার জানা প্রয়োজন? আর আমাকে ভাই বলে ডাকছেন কেন? আমি কি আপনার ভাই? আমাকে মানুষ স্যার স্যার বলে।“

আসাদ মিয়ার মেজাজ একটু বিগড়ে গেল। সে কম কিসে। স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতি করতেন। পকেটে মাল নিয়ে মিছিল করতেন। ক্ষমতার রদবদলে হল থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। ক্যম্পাসেও ঠিকঠাক যাওয়া হয়নি। ডিগ্রী শেষ করেছেন কষ্ট করে, কিন্তু চাকুরীর চেষ্টা করেনি। স্বল্পপুজি দিয়ে যে বইয়ের ব্যবসা শুরু করেছেন সেটা ভালোই চলছে। ইতিমধ্যে নিউমার্কেটে একটি পজিশন খুজছে। পেয়ে গেলে সেখানে বইয়ের দোকান দিবে। কিন্তু পজিশন পাওয়া যে কী ঝামেলা! কত নেতা পাতি নেতার কাছে যেতে হয়, হাদিয়া দিতে হয়!

আসাদ মিয়া চৌধুরী সাহেবকে বলছেন,

“স্যার ইংরেজি শব্দ যার অর্থ জনাব। এর অর্থ কিন্তু প্রভু নয়। সেই হিসেবে আপনি আমি সবাইকে স্যার বলে ডাকা যায়। এটা হচ্ছে অপরিচিত লোকদের সাথে কথা বার্তার একটি ফর্মাল শব্দ। কিন্তু আমরা বাংগালী, আমাদের ভাই ডাক বেশি ভালো লাগে। তাছাড়া মানুষ মানুষকে ভাই বলে ডাকলে সন্মান বেড়ে যায়।”

চায়ের দোকানের পাশে থাকা নেড়ি কুত্তার দল শব্দ করে, ভুক ভুক। মনে হচ্ছে কুত্তার দল বলছে ঠিক ঠিক।

“তবুও আপনি আমাকে স্যার বলবেন। আমি বিসিএস ক্যাডারের সচিব” চৌধুরী সাহেবের উত্তর।

“ঠিক আছে স্যার। এবার শুনুন স্যার। আপনাদের মাঝে এই বিসিএস ক্যাডারের একটি ইগো আছে। বিসিএস অর্থ বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস এখানে সিভিল মানে পাবলিক বা জনগণ, আর সার্ভিস মানে সেবা। অর্থাৎ জনগণের সেবার প্রদানের নিমিত্তে আপনাদেরকে সেবক হিসেবে রাখা হয়েছে। আর সেবা ফ্রী নেয়া হচ্ছেনা। বেতন ভাতা দেয়া হয়, সে অর্থ আপনারা জনগণের চাকর। আপনারা জনগণের প্রভু বা বস নন। হ্যা তবে আপনার অফিসে আপনার নিম্নপদস্থ চাকুরীজীবিদের বস।“

আবারও নেড়িকুত্তাদের শব্দ ভুক ভুক। চায়ের দোকানদার ময়লা পানি নেড়িকুত্তাদের উপর ছুড়ে মারে।

“যা, ভাগ।“

আসাদ মিয়ার কথায় চৌধুরী সাহেব মোটামুটি ধমকের সুরেই বলেন,

“জানেন মিয়া, আপনি কার সাথে কথা বলছেন। আমি চৌধুরী পরিবারের ছেলে। চৌধুরী মানে জানেন?”

আসাদ মিয়া বলেন, “জ্বি স্যার, ব্রিটিশ আমলে চৌধুরী সাহেবরা ব্রিটিশ লর্ডদের_–_-

পু পু হর্ণ বাজিয়ে আন্তনগর ট্রেনখানি ১ নম্বর প্লাটফর্ম এ দাড়িয়ে গেলো। তাড়াতাড়ি চৌধুরী সাহেব ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর বিজনেস ক্লাসে উঠলেন। মনে মনে আসাদ মিয়াকে গাল দিয়ে সিটে বসলেন। কিন্তু সিটের পাশে বসা লোকটা ঐ আসাদ মিয়া যার সাথে একটু আগে অসুখকর বাগচিৎ হয়েছে! চৌধুরী সাহেব মনে মনে পণ করলেন, আসাদ মিয়ার সাথে আর কোনো কথাই বলবেনা। চুপচাপ রইলেন।

যাত্রি সব উঠা শেষ। যাত্রীর কোলাহল থেমে গিয়েছে। তাই পানের দোকানের ক্যাসেট প্লেয়ারের গান স্পষ্ট কানে আসছে ” জিয়া ব্যাকারার হে কই বাহার হে, আজা মরে বালমা”। একসময় ট্রেন স্টেশনে লতা মংগেস্করের এসব গান খুবই শোনা যেতো। চৌধুরী সাহেব নষ্টালজিক মনে গান শুনছিলেন। আচমকা এক হকার বালকের কথার আওয়াজে বিরক্ত হলো।
বালক চেচিয়ে বলছে,
“ডিম, এই ডিম, ডিম লাগবে স্যার, ডিম, গরম ডিম। ”

চৌধুরী সাহেবের পাশে বসা আসাদ মিয়া ডাকছেন, ” ঐ ডিম, এদিকে আয়।”

আসাদ মিয়া একটু বাচাল টাইপের। ছাত্র জীবনে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দিতে অভ্যাস হয়েছে। এখনো সুযোগ পেলেই একটি দুটি বুলি কপচায়।
কিরে, কি নাম তোর? বেচা বিক্রি হয়? এটা দিয়ে সংসার চলে? পরিবারের সদস্য কয়জন? ইত্যাদি।

বালকের জবাব,
“গরীবের আর নাম। বাপ মায়ে রাখছে বাদশা মিয়া। নিজেই খাবার পাইনা, নাম আবার বাদশা। আফনে কন স্যার, বাপ মায়ের এ নাম রাখা ঠিক হয়েছে? তার উপর করি ডিম বিক্রি। পাবলিক ডিম বলে ডাকে। কবে যে শুনবেন মানুষ ডিম বাদশা বলে ডাকছে। তবে স্যার, যদি সফল ডিম ব্যবসায়ী হইতাম, টিভি চ্যানেলের লোক আইসা, আমারে ডিম বাদশা বললে ভালোই লাগত। শুনেন নি স্যার, পেঁপে বাদশা, গাজর বাদশা আছে। আমি ডিম বাদশা। পদবীটা চমৎকার না স্যার।”

আসাদ মিয়া হেসে হেসে বললেন,
“নাম আর কামে কি আসে যায়? পেশা আর নাম এগুলো মধ্যে মহত্ব নেই। মহত্ব হলো চরিত্রে। বুঝলা? চরিত্র খারাপ সব খারাপ। যেমন অনেকেরই নামের আগে পিছে চোর, ডাকাত এসব আছে। আমাদের এলাকায় একজন কুখ্যাত চোর আছে, নাম আব্দুর রহমান চোর। তুমি কও বাদশা মিয়া, এরকম একটি ভালো নাম নিয়ে চুরি করে! কত বড় খারাপ কাজ করে! ”

ট্রেনের গার্ড ফ্লাগ উচিয়ে বাশি দিয়েছে। ট্রেন ছেড়েছে। বাদশা মিয়া ও আসাদ মিয়ার কথোপকথনে চৌধুরী সাহেব বিরক্ত। বিড়বিড় করে বলছেন, “আসাদ মিয়া, যদি কোনদিন সুযোগ পেতাম, তোমার গরম ডিমের মজাটা দেখিয়ে দিতাম।”

ট্রেন চলতেই আসাদ মিয়া একটি সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি আর চটি সাহিত্য বিক্রি করবেননা। কারন বালকের কথায় সে মনে করেছেন যে, চটি বিক্রির কারনে একদিন তার নাম চটি আসাদ হলে বিষয়টি খুবই বিরক্তিকর।

যমুনা সেতুর উপর ট্রেন চলে আস্তে। কারণ সেতুর গঠন কাঠামো এমনভাবেই করা। শুরুতে ট্রেন লাইন বসানোর পরিকল্পনা ছিলনা। তাই একটি বৃত্তের পরিধির ৪.৮ কিমি কেটে সেতুর বানানো হয়েছে। বাকা হবার কারণে ট্রেন ধীরে চলে, সেই সাথে গার্ডার নেই।

আসাদ মিয়া চুপ থাকতে পারেইনা। আবার চৌধুরী সাহেবের সাথে কথা শুরু করলেন। “স্যার, আপনি চাইলে জানালার দিকের আমার আসনে বসতে পারেন।“

আসাদ মিয়ার এই প্রস্তাবের কারণ দুটি। একটি হচ্ছে, চৌধুরী সাহেবের সাথে একটু স্বাভাবিক হওয়া, দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, তার বরাবর করিডরের ওপাশের সিটে বসা সুন্দরী মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণ। সুযোগ পেলে দু একটি কথা বলা, পরিচয় হওয়া ইত্যাদি। একজন অবিবাহিত যুবকের জন্য পরের ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। সব সুন্দরী মেয়েরাই সম্ভাব্য পাত্রী। আমাকে কোন একবার এক লুলু পাগলা বলেছিলেন, ” বুঝলাইন ব্যাডা, যতদিন বিয়া না করলাইন, লক্ষ্ লক্ষ্ মাইয়ার স্বামী রইলাইন, যেদিন বিয়া করলাইন, একটি মাইয়ার স্বামী হইলাইন, আফনে বাইন্ড হইয়া গেলাইন গা।”

আসাদ মিয়া জানালার পাশে বসতে দিয়েছেন চৌধুরী সাহেবকে। এতে আরও বিপত্তি বেড়ে গেছে। প্রতি স্টেশনে ট্রেন থামতেই আসাদ মিয়া জানালার কাছে গিয়ে ডাকে, এই বুট, এই বাদাম। এভাবে একটার পর একটা খাবার কিনতে থাকে। চৌধুরী সাহেব বিরক্ত হয়ে এবার আবারও রেগে প্রশ্ন করেন,

“এটাতো বিজনেস ক্লাস, আপনি তো ক্লাসটির সন্মান রাখলেন না!”

আসাদ মিয়ার বরাবরই ত্যাড়া উওর,
“হ্যা, বিজনেস ক্লাস, সচিব ক্লাস না, আমি নিজেও বিজনেসম্যান।“
চৌধুরী সাহেবের প্রশ্ন,
“বিজনেসম্যান কি কোন পদের মধ্যে পরে?”

আসাদ মিয়া বলেন,
“সচিব স্যার, একটু খেয়াল করে দেখেন, সারা বিশ্বেই শীর্ষ ধনীদের তালিকায় বিজনেসম্যানরা। শুধু বেতনভুক্ত কোন চাকুরীজীবি শীর্ষ ধনী আছে? যদি থাকে, তবে তার চাকুরীর পাশাপাশি ব্যবসা আছে। ব্যবসায়ীরা টাকা তৈরী করে, চাকুরীজীবি ভাতার নিমিত্তে দাসত্ব করে। আমাদের ডঃ ইউনুস বলেছেন যে চাকুরী হচ্ছে আধুনিক দাসত্ব। উন্নত বিশ্বে বেশীরভাগ মানুষ বিজনেস বা অর্থনীতি বিষয়ক বিষয় বেশী পড়ে। তাদের লক্ষ্য থাকে উদ্যোক্তা হওয়ার। কিন্তু আমাদের দেশে বিপরীত। আমরা পড়ার বিষয় নির্বাচন করি চাকর বা কেরানী হবার লক্ষ্যে, মালিক হবার লক্ষ্যে নয়। আমাদের শিক্ষক অভিভাবক সবাই একই ধোকায় আছেন। প্রায়ই বলেন, লেখাপড়া না করে চায়ের দোকানদার হবি। এভাবেই আমাদেরকে শিশুকাল থেকেই চাকুরী নামের দাসত্বের দিকে প্রলুব্ধ করে। তাই আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে। আমরা বিদেশি সাহায্য ও ঋনের আশায় আজও তাকিয়ে থাকি। বিদেশি সাহায্যের রিলিফ চুরি করে বড়লোক হবার স্বপ্ন দেখি। সরকারি কেনাকাটায় ভাউচার গড়মিল করে পকেটে টাকা ভরি। জনগণের হক মেরে সেই টাকা দিয়ে রেস্তোরাঁয় বসে পরিবার নিয়ে ডিনার করি। ফেসবুক ভরিয়ে পোস্ট করি।“

আসাদ মিয়ার বক্তব্য যেন থামচেই না। চৌধুরী সাহেব বলেন, ঠিক আছে। আপনার কথা মেনে নিচ্ছি। এখন একটু রেস্ট নেই। চৌধুরী সাহেব চোখ বুজে ঘুমানোর ভান করলেন আসাদ মিয়ার বকবকানি থেকে বাচতে। কিন্তু আসাদ মিয়া চুপ থাকতে পারেনা। এক দুই করে আলাপ জমিয়ে ফেললেন ওপাশের সিটে বসা সুন্দরী মেয়েটির সাথে।

যাহোক, ট্রেন কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছেছে। আসাদ মিয়া চৌধুরী সাহেবের সাথে সৌজন্যবোধ দেখানো জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। এটাও তার রাজনৈতিক শিষ্টাচার থেকে শেখা।

অবশেষে উনারা যার যার গন্তব্যে চলে গেছেন। আসাদ মিয়া, চৌধুরী সাহেব এবং সুন্দরী মেয়েটি, কারোর সম্পর্কেই আর তেমন কোন খবর পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাবাজারে আসাদ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মালিক গল্পের সেই আসাদ মিয়া কিনা জানা যায়নি। আসাদ মিয়া বিয়ে শাদী করেছেন কিনা সেটাও অজ্ঞাত। তবে যতদুর জানা যায়, চৌধুরী সাহেব অবসরে আছেন, পেনশনের টাকায় ঢাকার অদূরে গাজিপুরে একটি বাড়ি করেছেন। সেই বাড়ির বেসমেন্টে বসে অল্প পরিসরে লজিস্টিকসের ব্যবসা করেন।

সমাপ্ত।

Please Share This Post in Your Social Media

এই জাতীয় আরো নিউজ

© All rights reserved © 2020 bd-bangla24.com

Theme Customized By Subrata Sutradhar