শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:১৪ অপরাহ্ন
Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ০১:৫০ PM
  • ৩৫ বার পড়া হয়েছে

বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক ভাবনা ও বাংলাদেশের উন্নয়ন

আজকের নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র চেতনা, অর্থনৈতিক দর্শন এবং পরবর্তীকালে আমরা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কী দিকদর্শন নিয়েছি এবং বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি সেখানে কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, সেটাই আলোচনা করব।

আসুন না বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের কর্মসম্পাদনে একটু দৃষ্টি দিই। বঙ্গবন্ধু প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষার ক্ষেত্রে যে কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন করতে চেয়েছেন, সেটা পর্যালোচনা করলে তাতে জনগণের প্রতি তার ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা, অর্থনৈতিক দর্শনই পরস্ফুিটিত হয়ে উঠবে। বঙ্গবন্ধু দেশ পরিচালনায় সাড়ে তিন বছর— ক্ষুদ্র একটি সময় পেয়েছিলেন। এ সময়ে বঙ্গবন্ধু কী করেছিলেন, সেটি পর্যালোচনা করলে অনেক বিষয় আমাদের কাছে আরো পরস্ফুিটিত হবে। বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছু আছে।
>
> বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে রওনা দিয়ে লন্ডন হয়ে ১০ তারিখে ঢাকায় ফেরেন। ঢাকার তেজগাঁও থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ তাকে প্রায় ৫ ঘণ্টা পাড়ি দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেতে হয়েছে। পথে পথে মানুষের ঢল। আমি নিজে সেখানে উপস্থিত ছিলাম, সারা দিনই।
>
> ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, আমাদের বিজয় দিবস। এ দিন সকালবেলা পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী তত্কালীন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের পূর্ব পাকিস্তান শাখায় রক্ষিত সব টাকা পুড়িয়ে দেয়। স্বর্ণ এবং অন্যান্য মূল্যবান রত্ন ও দলিল-দস্তাবেজ পাকিস্তানি বাহিনী আগেই সরিয়ে ফেলে। এমন একটা শূন্য অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন। তিনি দেশে আসার ২০ দিনের মাথায় ৩১ জানুয়ারি সর্বপ্রথম যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন, সেটি হলো বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন। সে সময়ের সুযোগ্য চারজন অর্থনীতিবিদ, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে দুই অর্থনৈতিক তত্ত্ব হাজির করে এ দেশের জাতীয়তাবাদের জাগরণে সহায়তা করেছিলেন, তাদের নিয়ে প্রথম পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেন। প্রফেসর নূরুল ইসলাম তিনি জিইডির প্রথম সদস্য (সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ) এবং সেই সঙ্গে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদাসম্পন্ন ছিলেন। আর তিনজন সদস্য ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদার।
>
> লক্ষ্য ছিল অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধার, সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা, পুনর্বাসন দ্রুততর করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা যাতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়। স্মরণ করতে পারি, ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হলেও জওহরলাল নেহরুর মতো জাতীয় বীর এবং একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতার কালেও দেশটির পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হয়েছে ১৯৫১ সালে, স্বাধীনতার প্রায় চার বছর পর। পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে, স্বাধীনতা লাভের প্রায় ছয় বছরের মাথায়। এখান থেকে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দেশকে দ্রুত এগিয়ে নেয়ার তাগাদা ছিল। শুধু পরিকল্পনা কমিশন নয়, স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একটি সংবিধানও প্রণয়ন করেন। এক বছরের মধ্যে তিনি সংবিধান তৈরি করেছেন। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি তা সই করেন। গণতান্ত্রিক বিশ্বের অন্যতম সুন্দর একটি সংবিধান, যে সংবিধানে শুধু গণতন্ত্রের মূল্যবোধ, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র নয়, সেখানে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন পাঁচটি মৌলিক বিষয়। যে বিষয়গুলো আজ আমাদের এমডিজি, এসডিজির মূল প্রতিপাদ্য—খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। সংবিধানের ১৫ (গ)-তে এটা উল্লেখ আছে। সেখানে তিনি লিখলেন, আমাদের অর্থনীতি পরিকল্পিতভাবে এগোবে। পরিকল্পনাটি তৈরি হলো এক বছরের মধ্যে, ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরের ১৪ জুলাই থেকে সেটির বাস্তবায়ন শুরু হলো। বিজয় অর্জনের তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী, যারা আমাদের মিত্রবাহিনী ছিল, তাদের ফেরত যেতে বাধ্য করা হয়। এখানে একটু স্মরণ করা যায়, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আমেরিকা জাপানে আসার পর আজ পর্যন্ত আমেরিকান বাহিনী সেখানে রয়েছে। ১৯৫৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার যুদ্ধে আসার পর যুক্তরাষ্ট্র আজও সেখানে রয়ে গেছে। ফিলিপাইন ১৯৪৫ সালে স্বাধীন হয়। যুক্তরাষ্ট্র একটি নেভাল বেস সেখানে গড়ে তোলে এবং এখনো আছে।
>
> ভারতের মতো বৃহৎ এবং সরাসরি আমাদের মুক্তিসংগ্রামে সহায়তাকারী দেশের সেনাবাহিনীকে তিন মাসের কম সময়ে বঙ্গবন্ধু ভারতে চলে যেতে বললেন। কত সাহস ও কত দূরদর্শিতাসম্পন্ন নেতা হতে পারেন বঙ্গবন্ধু, এ থেকেই আমরা কল্পনা করতে পারি।
>
> স্বল্পতম সময়ে তিনি ১০৭টি দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন। তিনি কৃষক, মজুর, সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি সবসময়ই আকৃষ্ট ছিলেন। তাদের মধ্যে থেকে তিনি উঠে এসেছেন। একটি বনেদি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ক্ষেতের আইল মাড়িয়ে তিনি রাজনীতি করেছেন। মানুষের বাড়িতে থেকেছেন। সেটি তিনি সারা জীবন ভোলেননি এবং তার মন থেকে তা দূরে যায়নি।
>
> ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় গোডাউনে যত খাদ্য ছিল, সব ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কৃষি উৎপাদন সম্ভব ছিল না। ধান যেটুকু হয়েছিল তা-ও কাটা সম্ভব হয়নি। ভারতে প্রায় এক কোটি লোক স্থানান্তরিত হয়েছিল। কৃষি একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। ২৫ বিঘা মানে প্রায় সব কৃষকের খাজনা মওকুফ করে দেন। সে সময়ে দেশে ভূমির আকার, মাথাপিছু বা পরিবারপ্রতি জমির পরিমাণ খুবই কম ছিল। প্রায় কোনো পরিবারই খাজনা মওকুফের সুবিধা থেকে বাদ পড়েনি। সব সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করে নিলেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল তৈরি করেন। পাট গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট করেন, যা একটি জুট স্টাডি সেন্টার ছিল। তুলা উন্নয়ন বোর্ড, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটও গঠন করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আনবিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র করলেন। বিএডিসি ও বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট পুনর্গঠন করেন। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলেন।
>
> বঙ্গবন্ধু কৃষিশিক্ষা আধুনিকায়নের জন্য নির্দেশ দিলেন। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, আমরা তাকে স্বাগত জানাই। সেই সঙ্গে তিনি কৃষি পেশাকে উজ্জীবিত করেন এবং গুরুত্ব দেন এই বলে যে ‘ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ সবাই একই বেতন স্কেল পাবেন, একই মর্যাদা পাবেন।’ আমাদের বললেন, ‘ফুল প্যান্ট নয়, তোমরা হাফ প্যান্ট পরে মাঠে নামবে। কৃষকের কাছ থেকে আগে কৃষি শিখবে। কৃষিকে তোমাদেরই উজ্জীবিত করতে হবে।’
>
> তিনি প্রকাশ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ডাক দিলেন। বললেন, আপনারা কোর্স কারিকুলাম এমনভাবে তৈরি করুন, যাতে আমরা খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে পারি। ১ ইঞ্চি জমিও ফেলে রাখা যাবে না।
>
> সমবায়ভিত্তিক গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও দলভিত্তিক ঋণ বিতরণের জন্য বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করলেন। স্বল্পতম সময়ে তিনি সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করলেন। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর জন্য আলাদা আলাদা হেডকোয়ার্টার তৈরি করলেন। নদী খননের জন্য বঙ্গবন্ধুর সময়ে সাতটি ড্রেজার কেনা হয়।
>
> মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ তৃতীয়, আম চাষে সপ্তম। কৃষির বিভিন্ন শাখা-উপশাখায় আমাদের সাফল্য রয়েছে। কৃষির আজকের সাফল্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধুই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ২০০৯ সালে আমাদের প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসেন। তার সময়কালে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম মূল্যস্ফীতি ছিল এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী বন্যা সফলভাবে তিনি মোকাবেলা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শ ধারণ করে তিনি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন। ২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশে কোনো পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ছিল না। তত্কালীন সরকার বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র গ্রহণ করে। অথচ সংবিধানের ১৫ (গ)-তে পরিষ্কার বলা আছে, আমরা পরিকল্পিত উন্নয়নের পথ অনুসরণ করব। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সময়ে একটি নয়া জাতীয় পরিকল্পনার যুগে আমরা প্রবেশ করি। এ পরিকল্পনা আগেরগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রম ছিল। আগেরগুলো ছিল বিনিয়োগ পরিকল্পনা, সেটার বাস্তবতাও ছিল। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময় সরকারি বিনিয়োগ ছিল ৮৭ শতাংশ আর ১৩ শতাংশ বিনিয়োগ আসত বেসরকারি খাত থেকে। সেটা ২০০৯-২০২১ সময়ে এসে আমরা দেখলাম ৭৭ শতাংশ বিনিয়োগ বেসরকারি খাত থেকে আসছে, বাকি ২৩ শতাংশ সরকারি বিনিয়োগ। তাই অভীষ্ট ও লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে কৌশলগত পরিকল্পনার দিকে এগোলাম। নতুন বিনিয়োগের প্রেক্ষাপটে পুরনো বিনিয়োগ পরিকল্পনার পদ্ধতি চালিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালে ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে আমরা সর্বপ্রথম সাড়ে ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিলাম। তারপর পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রথাগতভাবে তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালে, অর্থাৎ আশির দশকে আমরা ৩ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারিনি। কারণ পরিকল্পনা ছিল নামে মাত্র। সরকারগুলো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নয়, কেবল ক্ষমতা সংহতকরণে ব্যস্ত ছিল। সে সময়ে একটি পরগাছা রাজনৈতিক গোষ্ঠী গড়ে তুলতে প্রশাসনের সবাইকে নিয়োজিত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা দায়িত্বে এসে আমাদের পরিকল্পনাগুলোকে কৌশলগত ও লিভিং ডকুমেন্ট হিসেবে সামনে নিয়ে এলেন। তিনি বললেন, বেসরকারি খাত তৈরি হয়ে গেছে বলে তাদের কাজে লাগাতে হবে।
>
> কাজেই আমরা নীতি-কৌশল নির্ধারণ করলাম। লক্ষ্য স্থির করে দিলাম, একটি গুণগত পরিবর্তন আসল। এর আগে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা বাংলাদেশে ছিল না। রূপকল্প ছিল না। ভারত, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের ভিশন ডকুমেন্ট আমরা দেখতে পাই। কিন্তু বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করেন। এটি বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ২০২১ সালকে আমরা ধরলাম এই কারণে যে এ সময়ে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হবে। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করলাম—মধ্যম আয়ের দেশ হব। ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব, প্রাথমিক স্কুল ভর্তির হার ১০০ শতাংশে নিয়ে যাব। আমাদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৭২ বছরে নিয়ে যাব, যদিও ৭৩ বছরে পৌঁছেছি। আমরা ২০১০ সালেই এসব প্রক্ষেপণ করেছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেরণায় এমন দূরদর্শী পরিকল্পনা আমরা তৈরি করেছি। রূপকল্প-২০২১-এ আমরা বলেছি প্রতিবছর ৭ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করব। আমরা সেটা করেছি। আমরা বলেছিলাম দ্রুত মাতৃমৃত্যুর হার কমাব। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় এক লাখে ৪৯৪ যখন মা মারা যেতেন, আমরা সেটাকে ১৬৫-তে নামিয়ে এনেছি। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করেছি।
>
> লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি প্রত্যেক বছর প্রবৃদ্ধি কী হবে? কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দারিদ্র্য কতটা কমিয়ে আনব এবং বৈষম্য কমানোর জন্য কী করব। বৈষম্য কমানোর জন্য আমরা বলেছি গ্রামগুলো শহরের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। জনপথ, সড়ক এমনভাবে তৈরি হবে যেন শহর-গ্রামের পার্থক্যটুকু ঘুচে যায়। গ্রামেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বাজারগুলো আরো সমন্বিত হবে এবং ২০২১ সালের মধ্যে দেশের সবাইকে বিদ্যুৎ দেব। বিদ্যুৎ দেয়ার অর্থ হলো, প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রগুলোয় আরো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বৈষম্য বাড়বে না। আমরা গ্রামে শক্তিশালী সড়ক যোগাযোগ তৈরি করেছি। গ্রামে সামাজিক সুরক্ষা চালু করেছি। বাংলাদেশের প্রথম সুরক্ষা কৌশলপত্র ২০১৫ সালের ১ জুন অনুমোদিত হয়। সেটি প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত থেকে আমার নেতৃত্ব দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সেখানেই আমরা ঘোষণা করি যে ২০২৫ সালের মধ্যে সব দরিদ্রকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় আমরা ব্যাপক বিনিয়োগ করেছি। গ্রামকে শহরের সঙ্গে সংযোগ করেছি, যাতে বাজারগুলো সম্প্রসারিত হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টি এবং জনগণের প্রতি পিতার মতো তার যে ভালোবাসা, তা অশেষ। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘আমার বাবাও কৃষিকে ভালোবাসতেন। আমিও আপনাকে কৃষিবিদ হিসেবে দেশের পরিকল্পনার ভার দিলাম।’— আমার সঙ্গে প্রথম দেখায় তিনি একথা বলেছেন। আমাকে এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করে দেবেন, যাতে কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তিনি বলেন, কৃষি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেই দারিদ্র্য দ্রুত কমে আসবে। একজন বড় অর্থনীতিবিদও এত সঠিকভাবে বলতে পারেন কিনা, আমি জানি না। তিনি বললেন দারিদ্র্য কমানোর বড় উপায় হলো কৃষির বিকাশ ঘটানো। দেখবেন দারিদ্র্য আপনাআপনিই কমে আসবে। সেটিই হলো। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন, দূরদৃষ্টি, জনগণের প্রতি ভালোবাসা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মধ্যেও বিরাজমান। শুধু তা-ই নয়, আমরা ২০৪১ সালে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছি। তার জন্য রূপকাঠামো প্রধানমন্ত্রী ২০১৮-তেই দিয়েছেন। ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে আমরা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। সমাজের সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের মতামত নিয়েছি। আমরা এগুলো করেছি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই।
>
> বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। দারিদ্র্যমুক্ত মানে ৩ শতাংশের নিচে মৃদু দারিদ্র্য থাকবে। আর ২০৩১ সালের মধ্যে হতদরিদ্র নির্মূল হবে। দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশের কম হলে আন্তর্জাতিকভাবে এটিকে শূন্য দারিদ্র্য বলা হয়। আমরা রূপকল্প ২০৪১ -এ বলেছি কর্মহীনতা বা বেকারত্ব থাকবে না। আমরা বলেছি জিডিপিতে কৃষি ৫ শতাংশ অবদান রাখবে, বাকি ৪৫ শতাংশ শিল্প থেকে আসবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ হবে শিল্পায়িত একটি দেশ। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রক্ষা করা হবে। হিউম্যান রাইটস থাকবে এবং আমাদের দেশ বহুমতের ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ হবে। ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে এটিকে গড়ে তুলব। ২০৪১ সাল পর্যন্ত প্রত্যেক বছরে কী হবে, তা বর্ণনা করা হয়েছে রূপকল্প দলিলে। আমরা ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হব। দেশ এমন সুপরিকল্পিতভাবে এর আগে পরিচালিত হয়েছে বলে মনে হয় না। ২০০৯ সাল থেকে দেশ যেভাবে পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে এবং বাজেটের সঙ্গে পরিকল্পনার যেভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে, তা এর আগে ঘটেনি। বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করার অন্যতম কারণ হলো বাস্তবায়নযোগ্য সুন্দর পরিকল্পনা।
>
> বঙ্গবন্ধু যা করতে চেয়েছেন, তার কন্যা সেটিই করেছেন। বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছরে ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সেটার বিস্তরণ ঘটাচ্ছেন। সঠিক পথেই তিনি সেটা করছেন।
>
> আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানে নেয়ার জন্য সামগ্রিক প্রয়াস চালাতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর, ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাভিত্তিক, নৈতিকতাসহ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে দ্রুত ঢেলে সাজানো দরকার। আমরা মানবসম্পদ সৃষ্টির চেষ্টা করছি কিন্তু এক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে রয়েছি। কারিকুলামগুলোকে উন্নত করতে হবে। একে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
>
> আর যেটা চাইব সেটা হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য রাজনীতিকায়ন আরো উদার ও অংশগ্রহণমূলক হওয়া দরকার। দলের নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরো যোগ্য ব্যক্তি উঠে আসতে পারে, সেটার নিশ্চয়তা তৈরি করা প্রয়োজন। আসলে সঠিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করা ছাড়া ভবিষ্যতে গণতন্ত্র স্থিতিশীল হবে না। এক্ষেত্রে রাজনীতিকে আরো গণমুখী করতে হবে যাতে নেতৃত্বে নতুন মুখ আসতে পারে। আর অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছি, তেমনি আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটিও আরো শক্তিশালী করা দরকার। ক্ষমতার ভিত্তি হবে রাজনীতি। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই শক্তিশালী করতে হবে।

ড. শামসুল আলম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ
প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

Please Share This Post in Your Social Media

এই জাতীয় আরো নিউজ

© All rights reserved © 2020 bd-bangla24.com

Theme Customized By Subrata Sutradhar