বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ০৩:০০ অপরাহ্ন
Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ০৮:৪৪ PM
  • ৪৫ বার পড়া হয়েছে

যেতে যেতে পথে (১২)

অপরূপা ধরিত্রীর কিছুই হলো না দেখা!
মুহম্মদ আজিজুল হক
লেখক: চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত-

সেই শৈশব থেকে শুনে আসছি একটি ইংরেজী প্রবাদ, “Early to bed and early to rise, makes a man healthy, wealthy, and wise;”। শোনা পর্যন্তই। জীবনে ওটি পালন করার মতো সৎবুদ্ধি আমার কখনোই হয় নি। প্রত্যুষে কোথাও যাবার প্রোগ্রাম বা কাজের বিশেষ চাপ না থাকলে কখনোই এই উপদেশ আমি পালন করি নি। প্রবৃত্তিগতভাবেই এই উপদেশ পালন করার জন্য আমি উপযুক্ত ছিলাম না। কোনোদিনই আমি সকাল সকাল বিছানায় যেতে এবং সকাল সকাল বিছানা ছাড়তে প্রস্তুত ছিলাম না। ক্যাডেট কলেজ জীবনের কথা ছিল ভিন্ন। ওখানে যে একটি কঠোর রুটিন মেনে প্রতিদিন ভোরে জাগরণ এবং প্রতিটি কাজ বাঁধা সময়ের মধ্যে সমাপন কোরে রাত্রি দশটায় ঘুম আসুক বা না-ই আসুক শয্যায় গমন –সেসব ছিল বাধ্যতামূলক। মনের সাথে ঐ অনমনীয় রুটিন ছিল ভীষণ সাংঘর্ষিক। আমার প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগতি রেখে জীবনের অধিকাংশ সময়ে যে অভ্যেসটি আমার ছিল তা হলো Late to bed and late to rise –যা আমাকে কোরেছে unhealthy, unwealthy, and unwise। (“Unwealthy” শব্দটি এখনো ইংরেজী অভিধানে আসে নি; তবে এসে যাবে অচিরেই।) আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, “অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছো সুখে!…….” তাঁর সেই সুরের রেশ ধরে বলতে ইচ্ছে হয়, Healthy, wealthy, and wise হইও বন্ধু তোমরা যারা আছো সৌভাগ্যে। কোনো কঠোর রীতিনীতি, তা স্বাস্থ্য-শরীর, ইত্যাদির জন্য যতই উপকারক হোক, ভালো লাগে না আমার। কারণ, তা মনকে একপ্রকার দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলে। ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে খর্ব করে।

জীবনের অধিকাংশ সময় অট্টালিকার প্রাচীরাবদ্ধ শাহরিক পরিবেশে কাটানোতে গোধূলির রক্তিমাভায় বর্ণাঢ্য পশ্চিমাকাশ দেখা হয় নি বহুকাল দু’চোখ মেলে। সুদীর্ঘ ছাত্রজীবনের সমাপ্তিতে মধ্যবিত্ত পরিবারের দায়িত্বের অন্তত অংশবিশেষ কাঁধে নেবার উপযুক্ত হয়ে ওঠার নিমিত্তে বাবা-মা’র পরিয়ে দেয়া আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার জিঞ্জির পায়ে রেখে, এবং পরবর্তীতে চাকরিজীবনে দাসত্বের ঘানি টেনে এ অপরূপা বসুন্ধরার রূপ-রস-স্বাদ-গন্ধ কোনোদিনই পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা হোল না আমার। চতুর্দিকে আদিগন্ত উম্মুক্ত কোনো প্রান্তরে গিয়ে নির্তাড়িত ও নিরুদ্বেগ হৃদয়ে কোনো ঊষাকালের বা সাঁঝবেলার অপার্থিব সৌন্দর্য আবিষ্টচিত্তে উপভোগ করা হয় নি কোনোদিন। দেখা হয় নি কখনো কবি জীবনানন্দের “শিউলির বাবলার আঁধার গলির ফাঁকে জোনাকির কুহকের আলো,” “ভোরের দয়েল পাখি” কিংবা “লক্ষীপেঁচাটির মুখ”। দেখি নি কখনো নিস্তব্ধ নীরবতায় নিষ্পলক দৃষ্টিতে সায়াহ্নের নীলাম্বরে ফুটে ওঠা সপ্তর্ষি কিংবা অরুন্ধতীকে! কোনো কৌমুদীস্নাত রাত্রি্তে লতানো কলমির গন্ধ-মাখা বিলের প্রশান্ত মসৃণ জলে নীরবে এগোয় নি কখনো আমার ডিঙ্গি।

নিদ্রাহীনতা আমার একটি আশৈশব রোগ। শৈশবে কেউকে দিনের বেলায় ঘুমোতে দেখলে রুষ্ট হতাম। ভাবতাম, কেন এরা দিনে ঘুমোয়? দিন কি ঘুমানোর জন্য? ১৯৬৯ সালে আমার বাবা ফরিদপুরের শহরের বর্ধিষ্ণু এলাকা গোয়ালচামটে একখন্ড জমি কিনে সেখানে আমাদেরকে নিয়ে স্থায়ীভাবে সেটেল্ড হন। বৃটিশ আমলে ফরিদপুর শহরে হিন্দুদের খুব প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শৌর্যবীর্য ছিল। পাকিস্তান আমল ছাপিয়ে বাংলাদেশেও ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত সেই প্রতিপত্তির সুস্পষ্ট রেশ ছিল। তখন পর্যন্ত প্রতিটি পূজা-পার্বণে, বিশেষ কোরে দুর্গাপূজায় ফরিদপুর শহরের প্রাণ জেগে উঠতো –সারাটি শহর একটি উৎসবের মঞ্চ হয়ে উঠতো। অগণিত মন্ডপে মন্ডপে আলোকসজ্জায় পুরো শহর আলোকিত হয়ে উঠতো। নতুন কাপড়-চোপড় পরিহিত হাজার হাজার ছোট ছোট ছেলে মেয়ে, বৌ, কিশোর কিশোরী ও লোকেদের পদচারণায় প্রদীপ্ত হতো ছোট এই জেলা শহরটি। জাতপাত, ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষের প্রাণে বইতো আনন্দধারা। থেকে থেকেই মাইকে মাইকে হেমন্ত, মান্না দে, শ্যামলমিত্র, সতীনাথ, লতা, সন্ধ্যা, আশা ভোঁসলে, প্রমুখ প্রিয় শিল্পীদের গানে গানে মুখর থাকতো দিবস ও রাত্রির সকল প্রহর। বাসায় নিজ শয্যায় শায়িত থেকে নির্ঘুম রাতে নীরবে ঐসকল গান শুনতাম নিবিষ্ট মনে। মন তখন থাকতো এক অবর্ণনীয় আনন্দ-বেদনার দোলাচলে –অচেনা কোনো মানসীর কল্পনায়, কখনো রোমাঞ্চিত, কখনো বেদনাবিধুর। বিবাহোত্তরকালে জেনেছি আমার হবু সহধর্মিনী –যারাও ঐ শহরের বাসিন্দা ছিলেন –সারা রাত বিনিদ্র থেকে আমার মতোই সেসব গান শুনতেন এক পুলকিত-ব্যথিত হৃদয় নিয়ে।

শীতকালে গভীর রাতে শহরের ভেতরের পরিত্যক্ত পুরনো বাসষ্ট্যান্ডের আশেপাশে বসতো গানের জলসা। ঘণ্টার পর ঘন্টা ধরে চলতো লোকগীতি, জারি, সারি, মুর্শিদি, ইত্যাদি গানের আসর। আর বিছানায় শুয়ে শুয়ে ক্লান্তিহীন মন নিয়ে সেসব গান শুনে শুনে সারা রাত কেটে যেত আমার। অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যাওয়া হয় নি কখনো সেসব জলসায়। মনের গভীরে কোথায় যেন একটা বাধা অনুভব করতাম ঐসব গভীর রাতের গণজলসায় যেতে। একা একা যেতে ইচ্ছে হতো না। আবার কোনো উপযুক্ত সমমনা সঙ্গীও পাই নি কখনো। অথচ, অক্লান্ত কন্ঠে গেয়ে যেতো ঐসকল সঙ্গীতের অখ্যাত, উপেক্ষিত, ও অল্পশিক্ষিত গায়ক-গায়িকারা। তাঁদের গান শুনতে শুনতে মনে হতো পৃ্থিবীতে কত প্রকার পাগল যে আছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই; এবং তাঁদের বিবরণ দেয়া বোধকরি অসম্ভব। মস্তিষ্ক বিকল হয়ে যারা পাগল হন তারা তো প্রচলিত অর্থে পাগল। আমি অবশ্য সেসব হতভাগা রোগীদের কথা বলছি না। আমি সেসব পাগলদের কথা বলছি যাঁদের কারণে পার্থিব জীবনের সুন্দর দিকটি অধিকতর সুন্দর হয়েছে; এবং তাতে এত বৈচিত্র এসেছে। ঐসব লোক সঙ্গী্ত শিল্পীগণ এই শেষোক্ত দলের পাগল। কোনো লোভে বা লাভে তাঁরা গাইছেন না। কেবলমাত্র আপন প্রাণের আকুতির প্রকাশে হৃদয়-নিংড়ানো কাঁচা সুরে তাঁরা গাইছেন। অবিশ্বাস্য ও স্বতঃস্ফূর্ত অধ্যবসায়সহ মহান স্রষ্টাপ্রদত্ত প্রবৃত্তিগত শক্তিকে ব্যবহার কোরে এক নিমগ্ন আচ্ছন্নতায় কাজ কোরে যাঁরা পৃথিবীকে নিজেদের অজান্তেই সুন্দর কিছু দিয়ে যান তাঁরা সকলেই ঐ শেষোক্ত দলের বরেণ্য পাগল –এঁরা না থাকলে এই অপরূপা ধরিত্রী তার বিচিত্র রূপের বহুলাংশই হারিয়ে ফেলতো।

Please Share This Post in Your Social Media

এই জাতীয় আরো নিউজ

© All rights reserved © 2020 bd-bangla24.com

Theme Customized By Subrata Sutradhar